দর্শনা জয়নগর চেকপোস্ট সীমান্ত পথে বাংলাদেশ-ভারত যাতায়াতকারী যাত্রীর সংখ্যা বেড়েছে

0

২০১৮ সালের তুলনায় গত বছরের যাত্রী সংখ্যা ছিলো বেশি : বিদায়ী বছরে যাতায়াতকারীর সংখ্যা ৫ লাখ ৬০ হাজার
হারুন রাজু/হানিফ ম-ল: দর্শনা জয়নগর চেকপোস্ট দিয়ে সড়ক পথে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে পাসপোর্টধারী যাত্রীদের যাতায়াত ২০১৭ সালের তুলনায় ২০১৮ সালে বাড়লেও সে রেকর্ড অতিক্রম করেছে ২০১৯ সালে। যাত্রীসেবার মান আরও উন্নতিকরণে ইমিগ্রেশনের পাশাপাশি অন্যান্য বিভাগকে আন্তরিক হলে যাতায়াতকারী যাত্রী সংখ্যা আরো বাড়তে পারে। বিদায়ী বছরে এ রুটে যাতায়াতকারী যাত্রী সংখ্যা ৫ লাখ ৫৮ হাজার ১১৯ জন। ১৯৮৬ সালে দর্শনার জয়নগরে কাস্টমস ও ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট স্থানান্তরের পর বিগত ৩০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ যাত্রী যাতায়াত করেছিলো ২০১৭ সালে। ওই বছর ৪ লাখ ২০ হাজার ৯৮১ জন ভারত-বাংলাদেশ যাত্রী যাতায়াত করে স্মরণকালের রেকর্ড ভাঙে। ২০১৭ সালের রেকর্ড ভাঙা হয় পরের বছর ২০১৮ সালে। বিদায়ী বছর ভাঙলো ২০১৮ সালের রেকর্ড। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর ১৯৬২ সালে চুয়াডাঙ্গা জেলার দর্শনা দিয়ে ভারতের গেদে রেলরুটে যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল শুরু হয়। ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধকালে তা বন্ধ হয়ে গেলেও দেশ স্বাধীনের পর আবারও চালু হয়। এ সময় সীমিত আকারে হলেও রেলপথ ধরে পায়ে হেঁটে পাসপোর্ট যাত্রীদের চলাচল ছিলো। তখন ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করা হতো দর্শনা বর্তমানে আর্ন্তজাতিক রেল স্টেশনের ওপর ছোট্ট একটা কক্ষে। পরবর্তীতে যাত্রীদের সুবিধার কথা বিবেচনা করে ১৯৮৬ সালে দর্শনার সীমান্ত সংলগ্ন জয়নগরে কাস্টমস চেকপোস্ট স্থানান্তরের মধ্যদিয়ে শুরু হয় কার্যক্রম। তখন ট্রেন লাইন ধরে যাত্রীদের পায়ে হেঁটে ভারতের গেদে স্টেশনে পৌঁছুতে হতো। বর্তমানে রেল লাইনের পাশ দিয়ে পাকা সড়ক নির্মিত হয়েছে। পাশাপাশি বিজিবির উদ্যোগে রাস্তার দু’ধার দিয়ে লাগানো হয়েছে মনোমুগ্ধকর ফুলের বাগান, তা যেন আগতদের সর্বদা অভিবাদন জানাচ্ছে। অপর দিকে ভারতের অংশেও নির্মাণ করা হয়েছে পাকা সড়ক। ফলে যাত্রীরা ভ্যানযোগে সহজেই উভয় দেশের মধ্যে যাতায়াত করতে পারছে। বাংলাদেশের যেকোনো সীমান্ত রুটের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গের কোলকাতার সাথে ঢাকার দূরত্ব দর্শনা দিয়ে সড়ক পথে কম এবং রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ হওয়ায় এই রুটে যাত্রীদের চলাচল ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। অতীতের বছরগুলোতে যেখানে সারা বছরে ২/৩ হাজার যাত্রী যাতায়াত করতো, সেখানে ২০১৬ সালে এই রুটে বাংলাদেশ থেকে ভারতে যায় ১ লাখ ১৮ হাজার ৮৩৭ জন বাংলাদেশি। এদের মধ্যে ১৩ হাজার ৯৮১ জন ভারতীয় এবং ৪৭ জন অন্যান্য দেশি। একই সময় ভারত থেকে বাংলাদেশে আসে ১ লাখ ১৬ হাজার ৯৮৬ জন বাংলাদেশি। ১৩ হাজার ৪৩৮ জন ভারতীয় এবং ৫৫ অন্যান্য দেশি। অপর দিকে ২০১৭ সালে ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে ভারতে গেছে ২ লাখ ৪০ জন বাংলাদেশি, ১৪ হাজার ৭০২ জন ভারতীয় এবং ১০৩ জন অন্যান্য দেশি। ওই বছরেই ভারত থেকে বাংলাদেশে এসছে ১ লাখ ৯১ হাজার ১৪৮জন বাংলাদেশি। ১৪ হাজার ৯০৪ জন ভারতীয় এবং ৮৪ জন অন্যান্য দেশি অর্থাৎ ওই বছর সর্বমোট ৪ লাখ ২০ হাজার ৯৮১ জনের রেকর্ড সংখ্যক যাত্রী যাতায়াত করেছে। ২০১৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ভারত-বাংলাদেশ যাতায়াতকারী যাত্রী সংখ্যা ছিলো সর্বমোট ৪ লাখ ৯৯ হাজার ৪০৩ জন। যা বিগত বছরগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। যে কারণে ওই বছর সর্বকালের রেকর্ড ভাঙে। ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে ভারত-বাংলাদেশ যতায়াতকারি যাত্রী সংখ্যা ৪৩ হাজার ৪১৯, ফেব্রুয়ারিতে ৫৭ হাজার ৫১, মার্চে ৪৯ হাজার ৩১২, এপ্রিলে ৪৪ হাজার ২৯৩, মে ৪৩ হাজার ৫৪৭, জুনে ৪১ হাজার ১৩৩, জুলাইয়ে ৩৮ হাজার ৬০৮ ও আগস্ট মাসে ৪১ হাজার ৪২১, সেপ্টেম্বরে ২৫ হাজার ৫২৭, অক্টোবরে ৩৯ হাজার ৩৬, নভেম্বরে ৪৩ হাজার ৩৯৮ ও ডিসেম্বরে ৪৩ হাজার ৪৮ জন। ২০১৮ সালের রেকর্ড ভেঙে ২০১৯ সালে এ রুটে ভারত-বাংলাদেশ যাতায়াতকারী যাত্রী সংখ্যা ছিলো ৫ লাখ ৫৮ হাজার ১১৯ জন। এদের মধ্যে ভারতে যাওয়া যাত্রী সংখ্যা ২ লাখ ৮৭ হাজার ৫৭৪ ও আসা ২ লাখ ৭০ হাজার ৫৪৫ জন। দর্শনা জয়নগর ইমিগ্রেশন থেকে পাওয়া তথ্যনুযায়ী বিদায়ী বছরের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ-ভারত যাতায়াতকারী যাত্রী সংখ্যা ছিলো ৪১ হাজার ৪৪৪, ফেব্রুয়ারিতে ৫৪ হাজার ৭০, মার্চে ৪৭ হাজার ৫৪, এপ্রিলে ৪২ হাজার ৮৬৭, মে’তে ৩৯ হাজার ২৬১, জুনে ৪২ হাজার ৮৪৫, জুলাইতে ৪৩ হাজার ৮৩৩, আগস্টে ৫০ হাজার ২৫৬, সেপ্টেম্বরে ৪৬ হাজার ৮৪৬, অক্টোবরে ৪৮ হাজার ২১৫, নভেম্বরে ৪৮ হাজার ২৩৪ ও ডিসেম্বরে ৫৩ হাজার ১৯৪ জন। গত বছরের শেষের দিকে যাত্রী সংখ্যা বাড়তে শুরু করেছে বলে ধারণা করছে ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা। বাংলাদেশি যাত্রীদের হঠাৎ ভারতমুখী হওয়ার পেছনে যে কারণগুলো লক্ষণীয়- তার মধ্যে ভারত কর্তৃক ভিসা ব্যবস্থা সহজীকরণ, দেশের তুলনায় ভারতের চিকিৎসা ব্যবস্থা উন্নত, জিনিসপত্রের দাম কম ও বিশ্বাসযোগ্য এবং দর্শনীয় স্থান পরিদর্শনের প্রবণতা বৃদ্ধি ইত্যাদি। তবে দর্শনা রুটে যাত্রীদের সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধির জন্য চেকপোস্টের সঙ্গে দর্শনার সংযোগ সড়কগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মেরামত করা প্রয়োজন। এরই মধ্যে পূর্ণাঙ্গ স্থল বন্দর বাস্তবায়নের লক্ষে জয়নগর থেকে বাসস্ট্যান্ড রশিক শাহর মাজার পর্যন্ত সড়ক প্রশস্ত করে পাকাকরণ করা হলেও দর্শনা পুরাতন বাজার থেকে জয়নগর চেকপোস্ট সড়কটির কোনো কোনো স্থানে বেহাল দশায় পরিণত রয়েছে। এ সড়ক মেরামত কাজও চলছে। পাশাপাশি চেকপোস্টে ভ্রমণকর পরিশোধের সুবিধার্থে সোনালী ব্যাংকের একটি বুথ খোলা প্রয়োজন জয়নগরে। কারণ কোনো যদি যাত্রী ভুলক্রমে ট্রাভেল ট্যাক্স (ভ্রমণকর) প্রদান করে না আসলে, তাকে আবার ৪ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে দর্শনায় ফেরত আসতে হয়। একই সাথে ঢাকা-খুলনাগামী ডাউন আন্তঃনগর চিত্রা এক্সপ্রেস ট্রেনের দর্শনা হল্ট স্টেশনে স্টপেজ দিলে ঢাকা থেকে আগত যাত্রীদের জন্য এই পথ আরও সহজতর হবে। জয়নগর চেকপোস্টে শুরু থেকেই কাস্টমসের একটি ছোট কক্ষে ইমিগ্রেশন কার্যক্রম পরিচালনা করতে অনেকটাই বিঘিœত হচ্ছে। তবে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ যাত্রী সেবা নিশ্চিত করতে ব্যবস্থা করেছে ৫টি কম্পিউটারসহ আধুনিক সরঞ্জাম। এ ইমিগ্রেশনের কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে রয়েছেন ২জন উপ-পরিদর্শক, ৪জন সহকারী উপ-পরিদর্শকসহ ১০ জন পুলিশ কনস্টবেল। এছাড়া অপেক্ষমাণ যাত্রীদের জন্য কাস্টমসের বারান্দায় একাধিক ফ্যান ও বিশুদ্ধ পানীয় ব্যবস্থা করা হয়েছে। ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের যাত্রীসেবামূলক ব্যবস্থা থাকলেও কাস্টমস কর্তৃপক্ষ অনেকটাই উদাসীন। ২ জন সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ও ৫ জন সিপাহী সকাল ৭টা থেকে সন্ধ্যা ৬ টা পর্যন্ত টানা ১১ ঘণ্টা তাদের কার্যক্রম করে থাকে। বাড়তি হিসেবে রয়েছে একজন আনসার সদস্য ও একজন এনজিও। বিজিবি চেকপোস্টের ইনচার্জের সাথে কথা বললে তিনি কোনো তথ্য দিতে রাজি হননি। ফলে তাদের কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে সুবিধা-অসুবিধা জানা না গেলেও সম্প্রতি ভারত-বাংলাদেশ যাতায়াতকারী যাত্রীদের স্বাক্ষর গ্রহণের ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। সার্বক্ষণিক নারী বিজিবি সদস্যও রাখা হয়েছে যাত্রী সেবার মান বাড়াতে। যাত্রীদের ইমিগ্রেশন-কাস্টমসের প্রয়োজনীয় কার্যক্রম শেষ করে থমকে যেতে হচ্ছে বিজিবি চেকপোস্টে। দীর্ঘ লাইনে পরিণত হলেও তা দ্রুত সমাধানে প্রাণপণ চেষ্টা চালাতে দেখা যায় বিজিবি সদস্যদের। এ দিকে ৩ কোটি ৫৪ লাখ টাকা ব্যয়ে দর্শনা জয়নগর ইমিগ্রেশনের ৩ তলা ভবন নির্মাণ কাজ শুরু করা ২০১৭ সালের ৩০ এপ্রিল। নির্মাণ কাজ প্রায় শেষের দিকে এমন তথ্য প্রায় সময় শোনা যায়। শেষ হতে হতে কবে নাগাদ শেষ হবে তা হয়তো এখনো অশ্চিত। গত বছরের শুরুতে নতুন ভবনে কার্যক্রম চালু করার কথা শোনা গেলেও আজ অবধি চলছে নির্মাণ কার্যক্রম। আসলে কবে নাগাদ নতুন ভবনে ইমিগ্রেশনের কার্যক্রম শুরু হবে তা এখন অপেক্ষার প্রহন গোনা ছাড়া কিছুই না। নতুন ভবনে কার্যক্রম শুরু হলে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে যাত্রী সেবা আরও বাড়বে বলে মনে করছেন কর্মঠ-দক্ষ ও দূরদর্শী ইমিগ্রেশন ইনচার্জ এসআই রাশিদুল হাসান। রাশিদুল হাসান জানান, আন্তরিক মনোভাব নিয়ে দায়িত্ব পালনে সফলতা হবেই হবে। আমি বিশ্বাসের সাথে বলতে পারি সকলে নিজ নিজ দায়িত্বে দরদি হলে এ রুটে বাংলাদেশ-ভারত যাতায়াতকারী যাত্রী সংখ্যা বহুগুনে বাড়বে। নির্মাণাধীন এ ভবনটি শীতাতাপ নিয়ন্ত্রিত করণ করা হবে। সচেতন মহল মন্তব্য করে বলেছেন, দর্শনা জয়নগর চেকপোস্ট দু’দেশে যাতায়াতের আন্তর্জাতিক রুট। এ রুটে যাত্রীসেবা, দেশের মর্যাদা বৃদ্ধিতে আরও আন্তরিক হতে হবে চেকপোস্ট সংশ্লি¬ষ্ট সকলকে। কোনোভাবে যাত্রী হয়রানির শিকার না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে দায়িত্বরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের।

Loading Facebook Comments ...

প্রত্যুত্তর দিন

অনুগ্রহ করে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করে আপনার নাম লিখুন