ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় ধাক্কা

বাংলাদেশি পণ্যের ওপর নতুন করে ৩৭ শতাংশ রিসিপ্রোকাল ট্যারিফ বা পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন। এদেশের মোট পণ্য রপ্তানির ১৮ শতাংশের গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্রে হওয়ায় নতুন শুল্কের কারণে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের বড় বাজারটিতে বড় ধাক্কার আশঙ্কা করছেন রপ্তানিকারকরা। এতদিন যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর শুল্ক ছিলো গড়ে ১৫ শতাংশ। এদিকে ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তে দুনিয়াজুড়েই তোলপাড় শুরু হয়েছে। কারণ শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ওপরই শুল্ক বসিয়েছেন ট্রাম্প। প্রতিক্রিয়ায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন বলেছে, ট্রাম্পের এ সিদ্ধান্ত বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় ধাক্কা। অস্ট্রেলিয়া এই সিদ্ধান্তকে অবন্ধুসুলভ আখ্যা দিয়েছে। চীন তো প্রতিশোধের ঘোষণাই দিয়েছে। বিশ্বনেতাদের এমন প্রতিক্রিয়াই বুঝিয়ে দিচ্ছে, এ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ট্রাম্প বিশ্বজুড়ে বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু করে দিলেন।
দেখা গেছে, যে দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য-ঘাটতির আনুপাতিক হার বেশি, সেদেশের ওপরই বেশি হারে পাল্টা শুল্ক বসিয়েছেন ট্রাম্প। স্বাভাবিকভাবেই এতে এশিয়ার দেশগুলোর ওপর বড় অঙ্কের শুল্ক আরোপিত হয়েছে। যদিও ব্যাখ্যা হিসাবে ট্রাম্প বলেছেন, যেহেতু অনেক দিন ধরে অন্যান্য দেশ দুর্বল নিয়ম-কানুনের সুযোগ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে লুট করে চলেছে, তাই এই পালটা পদক্ষেপ। বিশ্লেষকরা বলছেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দেশটির এ পরিমাণ শুল্ক-বৃদ্ধির নজির নেই। কাজেই শেষমেশ মার্কিন ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা কেমন থাকে, তার ওপর এ সিদ্ধান্তের সফলতা-ব্যর্থতা নির্ভর করবে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের ৮০ শতাংশই তৈরি পোশাক। সেই পোশাক রপ্তানির একক বড় বাজার হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশ তৃতীয় শীর্ষ তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ। ফলে ট্রাম্পের পালটা শুল্ক আরোপে দেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের কপালে চিন্তার রেখা দেখা দিয়েছে। তারা বলছেন, সব দেশের ওপর পালটা শুল্ক আরোপ হওয়ায় তৈরি পোশাকের দাম বাড়বে। তাতে পোশাকের চাহিদা কমে যেতে পারে। তাছাড়া শুল্ক বৃদ্ধি পাওয়ায় দাম কমাতে উৎপাদকদের চাপে রাখবে ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো। এতে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা পড়বেন বিপদে। শুধু তৈরি পোশাক নয়, যুক্তরাষ্ট্রের পালটা শুল্কের কারণে চামড়াপণ্য, হোমটেক্সটাইল, হিমায়িত মাছ ও চিংড়ি, পাটপণ্যসহ বিভিন্ন পণ্যের রপ্তানিতেও ধাক্কা আসার শঙ্কা রয়েছে।
তবে প্রতিটি প্রতিকূল পরিস্থিতির একটা বিপরীত ইতিবাচক সম্ভাবনাও থাকে। লক্ষ্য করলে দেখা যায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গার্মেন্ট রফতানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ ভিয়েতনাম ও শ্রীলংকার ওপর যথাক্রমে ৪৬ ও ৪৪ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে নতুন শুল্কনীতির ভারসাম্য কিছুটা বাংলাদেশের অনুকূলে রয়েছে। তবে ভারত ও পাকিস্তানের শুল্ক বাংলাদেশের চেয়ে কম হওয়ায় তারা বাড়তি সুবিধা পেতে পারে। অবশ্য পরিবর্তিত রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতায় ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের গতিশীল কূটনৈতিক যোগাযোগের যে লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, তাতে উচ্চতর পর্যায়ে আলোচনা ও সমঝোতার মধ্যদিয়ে বাংলাদেশের ওপর আরোপিত শুল্কসহ রফতানি পণ্যের মূল্য যৌক্তিক পর্যায়ে আনা অসম্ভব নয়। বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব এবং বাণিজ্যিক অংশীদারত্বের প্রশ্নে সরকারের উচিত ট্রাম্প প্রশাসনের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে লবিং জোরদার করা। দেশের অর্থনীতিতে কোনো ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আগেই তা করা হবে, এটাই প্রত্যাশা।