স্টাফ রিপোর্টার: জুলাই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া শিক্ষার্থীদের গঠিত নতুন রাজনৈতিক দলের দায়িত্ব নিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন নাহিদ ইসলাম। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর গঠিত সরকারে এতদিন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে তিনি পদত্যাগপত্র জমা দেন। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী প্ল্যাটফরম বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বে এবং জাতীয় নাগরিক কমিটির উদ্যোগে নতুন রাজনৈতিক দল গঠন হচ্ছে। নাহিদ ইসলাম এই দলের নেতৃত্ব দেবেন বলে গুঞ্জন রয়েছে। আর সে কারণে তিনি উপদেষ্টার পদ থেকে পদত্যাগ করবেন বলেও কিছু দিন ধরেই আলোচনা চলছিল। আগামী শুক্রবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) নতুন এই রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশ ঘটতে যাচ্ছে বলেও ইতিমধ্যে ঘোষণা দেয়া হয়েছে। পদত্যাগপত্র জমা দেয়ার পর প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনার সামনে এক সংবাদ সম্মেলনে নাহিদ ইসলাম বলেছেন, ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, সরকারের বাইরে দেশের যে পরিস্থিতি, সেই পরিস্থিতিতে একটি রাজনৈতিক শক্তির উত্থানের জন্য আমার রাজপথে থাকা প্রয়োজন। ছাত্র-জনতার কাতারে থাকা প্রয়োজন। নাহিদ বলেন, ‘গণঅভ্যুত্থানের পরিপ্রেক্ষিতে ৮ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের প্রতিনিধি হিসেবে আমরা তিনজন অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেই। তখন দেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও গণঅভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নের জন্য দায়িত্ব গ্রহণ করা আমাদের কাছে মনে হয়েছিল যৌক্তিক। গত সাড়ে ছয় মাসের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার কাজ করছে। হয়তো আমরা আশানুরূপ ফলাফল এখনো পাইনি। কিন্তু আমার কাছে মনে হয়েছে সরকারে একটা স্ট্যাবিলিটি এসেছে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের যে আকাক্সক্ষা করি, সে আকাক্সক্ষার জন্য এবং গণঅভ্যুত্থানে যেসব ছাত্র-জনতা অংশগ্রহণ করেছে, সেই শক্তিকে সংহত করতে আমি মনে করছি সরকারের থেকে সরকারের বাইরে রাজপথে আমার ভূমিকা বেশি হবে। বাইরে যে আমাদের সহযোদ্ধা রয়েছে তারাও এটি চান। এর পরিপ্রেক্ষিতে আজকে মূলত পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছি।’ নাহিদ ইসলাম আরো বলেন, ‘গত ৬ মাসে আমি চেষ্টা করেছি আমার দায়িত্ব পালন করে যাওয়ার। মন্ত্রণালয়ে আমরা কিছু কাজ করেছি। তার ফলাফল সামনে হয়তো দেখা যাবে। ছয় মাস খুবই কম সময়, তার পরও আমি চেষ্টা করেছি। আজকে থেকে আমি সরকারের আর কোনো দায়িত্বে নেই।’ এ সময় তিনি বলেন, ‘আমি উপদেষ্টা পরিষদ থেকে পদত্যাগ করেছি। একই সঙ্গে অন্যান্য যেসব কমিটির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম সেখান থেকেও আজকে পদত্যাগ করেছি।’ উপদেষ্টা পরিষদের তার স্থলে কে দায়িত্ব নেবেন, এ প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘পরবর্তী সময়ে দায়িত্ব কে নেবেন, সেটি ক্যাবিনেট সিদ্ধান্ত নেবে।’ নতুন যে রাজনৈতিক দল গঠন হচ্ছে, সেখানে যুক্ত হওয়ার অভিপ্রায় আছে বলেও জানান বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম এই নেতা। পদত্যাগপত্রে নাহিদ ইসলাম উল্লেখ করেন, মহোদয়, আমার সশ্রদ্ধ সালাম গ্রহণ করুন। প্রথমেই আমি জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহিদ ও আহত সহযোদ্ধাদের শ্রদ্ধা ভরে স্মরণ করছি। রক্তক্ষয়ী গণ-অভ্যুত্থানের পরে ছাত্র-জনতার আহ্বানে সাড়া দিয়ে পরিবর্তিত নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের দায়িত্ব গ্রহণ করার জন্য আপনার প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা। বৈষম্যহীন, ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত উন্নত বাংলাদেশ গড়তে আপনার নেতৃত্বে গঠিত উপদেষ্টা পরিষদে আমাকে সুযোগ দানের জন্য আপনাকে আন্তরিক ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি। চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, গত ৮ আগস্ট শপথ নেয়া উপদেষ্টা পরিষদে আমি ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং তথ্য ও সমপ্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাই। নানামুখী চ্যালেঞ্জের মধ্যেও আপনার নেতৃত্বে দায়িত্ব পালনে সদা সচেষ্ট থেকেছি। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে আমার ছাত্র-জনতার কাতারে উপস্থিত থাকা উচিত মর্মে আমি মনে করি। ফলে আমি আমার দায়িত্ব থেকে ইস্তফা দেওয়া সমীচীন মনে করছি। তিনি উল্লেখ করেন, এমতাবস্থায়, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং তথ্য ও সমপ্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা পদ থেকে অব্যাহতি চাচ্ছি। আমার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করতে মহোদয়কে সবিনয় অনুরোধ করছি। এদিকে উপদেষ্টা পদ থেকে পদত্যাগের পর নাহিদ ইসলামকে ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আখ্যা দিয়ে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম এবং উপ-প্রেস সচিব অপূর্ব জাহাঙ্গীর। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে শফিকুল আলম লিখেন, দেশের সামপ্রতিক ইতিহাসে অন্যতম তীক্ষ্ন রাজনৈতিক চিন্তাধারার অধিকারী নাহিদ ইসলাম। তার বয়স মাত্র ২৬ বছর কিন্তু এরইমধ্যে নৃশংস স্বৈরাশাসকের বিরুদ্ধে গণজাগরণে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি আগামী কয়েক দশকে দেশের রাজনীতিতে বড় ভূমিকা রাখবেন। আল্লাহ জানে, একদিন হয়তো তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রীও হতে পারেন। অপূর্ব জাহাঙ্গীর ফেসবুক পোস্টে লিখেন, একদিন তিনি প্রধানমন্ত্রী হবেন। আপনি বাজি ধরতে পারেন।