চলতি আখ মাড়াই মরসুমে চিনি কারখানায় লোকসানের বোঝা হতে পারে ভারী
অপেক্ষার পালা শেষে আশার গুড়ে বালি : বিএমআরই প্রকল্পে মাড়াই হলো না আখ
দর্শনা অফিস: শত কোটি টাকা ব্যায়ে নির্মানাধীন বিএমআরই প্রকল্পে কারখানায় আখ মাড়াই সম্ভব হলোনা এ মরসুমেও। অপেক্ষার পালা শেষে আশার গুড়ে যেন বালি পড়লো। এবারের মরসুমে চিনি কারখানায় লোকসানের বোঝা আরো ভারী হওয়ার সম্ভবনা রয়েছে। কে নেবে এ দায়ভার?
জানা গেছে, দেশের সবকটি চিনিকলের আখ মাড়াই কার্যক্রম শুরু হয় ২০২৪ সালের নভেম্বরের শুরু থেকে। পর্যায়ক্রমে ডিসেম্বরের শুরুতে কেরুজ চিনিকলে ২০২৪-২৫ আখ মাড়াই শুরু হওয়ার কথা থাকলে তা হয়নি। কারণ হিসেবে জানা গেছে, বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের সিদ্ধান্ত মোতাবেক ২০ ডিসেম্বর কেরুজ আখ মাড়াই কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করা হয়। এতে আখচাষিদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করলেও বর্তমান ব্যবস্থাপনা পর্ষদ তাদের বুঝিয়ে নিয়েছিলো। দেরিতে আখ মাড়াইয়ের কারণে একদিকে যেমন আখ শুকিয়ে লোকশান গুনেছে, অন্যদিকে অন্যান্য ফসল চাষে হয়েছে বিলম্ব। ফলে চরমভাবে দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে কৃষকদের। তথ্যানুযায়ী এ মরসুমে ৫ হাজার ১শ একর জমিতে আখচাষ ছিলো। যার মধ্যে কৃষকের জমির পরিমাণ ৩ হাজার ৪৫৫ ও কেরুজ নিজস্ব জমিতে ছিলো ১ হাজার ৬৪৫ একর আখ। ৬৫ মাড়াই দিবসে ৬৫ হাজার মেট্রিকটন আখ মাড়াইয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত ছিলো। আখ মাড়াইয়ের গড় হার ছিলো ১ হাজার ১৫০ মেট্রিকটন। চিনি আহরণের গড় হার নির্ধারণ করা ছিলো ৬ দশমিক শূন্য শতাংশ। চিনি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ৪ হাজার ২শ মেট্রিকটন। সবই ছিলো ঠিকঠাক। চিনি কারখানা বড় ধরণের তেমন কোন যান্ত্রিক ত্রুটির কবলেও পড়তে হয়নি। গত ১০ ফেব্রুয়ারি ৫২ মাড়াই দিবসে আখ মাড়াই কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়। সে সময় পর্যন্ত কেরুজ নিজস্ব সহ কৃষকদের প্রায় ১ হাজার ৪শ একর জমিতে আখ ছিলো। ওই আখ ২৫ ফেব্রুয়ারিতে বিএমআরই (আধুনিকায়ন) চিনি কারখানায় মাড়াইয়ের মাধ্যমে উদ্বোধন করার প্রস্তুতি ছিলো। গতকাল ২৫ ফেব্রুয়ারি সে গুড়ে যেন বালি পড়েছে। আধুনিকায়নকৃত কারখানার পাউয়ার টার্বাইন সমস্যা জনিত কারণে তা সম্ভব হয়নি। বিএমআরই কেরুজ প্রকল্প পরিচালক ফিদাহ হাসান বাদশা জানান, পাওয়ার টার্বাইন সমস্যা দ্রুত নিরসন করণে জোরেসোরে কাজ চলছে। আশা করা যাচ্ছে আগামী ৪-৫ দিনের মধ্যে এ কাজ সম্পন্ন করা হলে ওয়াটার ট্রাইলের মাধ্য প্রস্তুত করা হবে। ফলে আগামী আখ মাড়াই মরসুমে আধুনিকায়নকৃত এ কারখানায় আখ মাড়াই করতে পারবে কেরুজ চিনিকল কর্তৃপক্ষ।
এদিকে চিনিকল কর্তৃপক্ষ থেকে পাওয়া তথ্যনুযায়ী গত ১০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আখ মাড়াই করা হয়েছিলো ৬০ হাজার ৪৪০ মেট্রিকটন। তাতে চিনি উৎপাদন করা হয়েছে ৩ হাজার ১২৮ মেট্রিকটন। গতকাল মঙ্গলবার সকালে ফের পুরনো পন্থায় আখ মাড়াই শুরু করেছে কেরুজ চিনিকল কর্তৃপক্ষ। ধারণা করা হচ্ছে ১৪ হাজার মেট্রিকটন আখ মাড়াই করা হতে পারে আগামী ১০-১২ মাড়াই দিবসে। তাতে চিনি উৎপাদনের সঠিক হিসাব বলা মুশকিল। কারণ হিসেবে জানা গেছে, কারখানা বন্ধ থাকায় স্ট্রিম ও রিকভারি হার কমতে পারে। তবুও খুব ভাল হলেও ৪শ মেট্রিকটন চিনি উৎপাদন হতে পারে। সেক্ষেত্রে এবার আখ মাড়াইয়ের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ১০ হাজার মেট্রিকটন অতিক্রম করলেও চিনি উৎপাদনের ক্ষেত্রে তা পূরণ হচ্ছে না। লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় চিনি উৎপাদন কম হতে পারে ৭শ মেট্রিকটন। ৮৭ বছরের পুরাতন এ মিলটি জোড়াতালি দিয়েই প্রতি মাড়াই মরসুমে চালু করা হয়ে থাকে। যে কারণে চিনি আহরণের গড় হার স্বাভাবিকভাবে কমে যাচ্ছে বলেও মন্তব্য কারখানা শ্রমিক-কর্মচারীদের। কেরুজ চিনিকলের এবারের আখ মাড়াই মরসুম দেরিতে চালু করা ও মাঝখানে ১৫ দিন বন্ধ রাখায় লোকসানের দায়ভার কে নেবে এমনটি মন্তব্য করেছেন শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি ফিরোজ আহমেদ সবুজসহ অনেকেই।
সবুজ বলেন, এ ঘাটতি পূরণে কৃষকদের ধকল পোহাতে হবে কমপক্ষে ২ বছর। তবুও এ অঞ্চলের অন্যতম অর্থনৈতিক চালিকা শক্তি কেরুজ চিনিকলটি রক্ষায় সকলের প্রতি আখচাষের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। মিলের মহাব্যবস্থাপক (কৃষি) আশরাফুল আলম ভূইয়া বলেছেন, এবারের রোপণ মরসুমের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথে। সর্বমোট ৬ হাজার একর জমির মধ্যে ৫ হাজার ১২শ একর জমিতে রোপণ কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়েছে। আশা করছি বাকী দিনগুলোর মধ্যে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে ইনশাল্লাহ।
মহাব্যবস্থাপক (কারখানা) সুমন সাহা বলেন, মিল বন্ধ থাকায় তেমন বেগ পেতে হবে না। যে পরিমাণ আখ রয়েছে তা মাড়াই করে সন্তোষজনক পরিমাণ চিনি উৎপাদন হবে বলে ধারণা করছি। কেরুজ চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাব্বিক হাসান বলেন, করপোরেশন সিদ্ধান্ত মোতাবেক সকল কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে আধুনিকায়ন চিনি কারখানায় আখ মাড়াইও ছিলো এ অঞ্চলের সাধারণ মানুষ ও কৃষকদের স্বপ্ন। যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে যেহেতু কৃষকদের আখ কর্তনে বিলম্ব হয়েছে, সেহেতু তাদের ঘাটতি পুষিয়ে দিতে আমরা প্রনোদনার ব্যবস্থাও করেছি।
জানা গেছে, ২০১২ সালের ১ জুলাই কেরুজ চিনিকলটি বিএমআরই (আধুনিকায়ন) করণ কার্যক্রমের অনুমোদন হয় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে। শুরুতে ৪৬ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও প্রয়োজনে ও পর্যায়ক্রমে তা বৃদ্ধি পায়। শেষ অবধি ১০২ কোটি ২১ লাখ ৩৮ হাজার টাকা ব্যায়ে বিএমআরই প্রকল্পের কাজের দায়িত্ব পায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রিত মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি। চুক্তি মাফিক এ কাজ শেষ করণের নির্ধারিত তারিখ চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত।
মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়, কিন্তু ট্র্যাকব্যাক এবং পিংব্যাক খোলা.