রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের ফেরা নিয়ে নতুন বিতর্ক
হাসনাত আব্দুল্লাহর স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করে ব্যাপক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া
স্টাফ রিপোর্টার: তরুণদের নেতৃত্বে ২৮ ফেব্রুয়ারি আত্মপ্রকাশ করা জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ দাবি করেছেন, সাবেক মন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরী, জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসকে সামনে রেখে বাংলাদেশে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন করার চেষ্টা চলছে। বিষয়টিকে তিনি ‘রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ’ নামে ‘নতুন একটি ষড়যন্ত্র’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। বৃহস্পতিবার দিবাগত গভীর রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেইজে দেয়া এক স্ট্যাটাসে তিনি এ দাবি করেন। হাসনাত আব্দুল্লাহর এই স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করে রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের ফেরা এবং আগামী নির্বাচনে দলটিকে অংশগ্রহণ করতে দেয়া, না দেয়ার প্রশ্নে বিভিন্ন প্ল্যাটফরমে নতুন করে ব্যাপক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলছে তুমুল বিতর্ক। বিএনপি ও জামায়াতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা এবং ছাত্রসংগঠনগুলোও প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধের দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাঙ্গনে গতকাল শুক্রবার মিছিল-সমাবেশ হয়েছে। হাসনাত আব্দুল্লাহর এই স্ট্যাটাসের কয়েক ঘণ্টা আগে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সম্পর্কে বলেছেন, ‘দলটিকে নিষিদ্ধ করার কোনো পরিকল্পনা অন্তর্বর্তী সরকারের নেই। তবে, দলটির নেতৃত্বের মধ্যে হত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের দেশের আদালতে বিচার করা হবে।’ প্রধান উপদেষ্টার এই বক্তব্যের কয়েক ঘণ্টা পরেই হাসনাত আব্দুল্লাহ তার ফেসবুকে লিখেছেন, ‘ড. ইউনুস, আওয়ামী লীগ ৫ আগস্টেই নিষিদ্ধ হয়ে গেছে। …প্রেসক্রিপশনে আওয়ামী লীগের চ্যাপটার ওপেন করার চেষ্টা করে লাভ নেই।’ যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া গতকাল বিকেলে ফেসবুকে দেয়া এক পোস্টে বলেছেন, ‘নির্বাচন পিছিয়ে যাবে, অনিশ্চয়তা তৈরি হবে-এসব শঙ্কার কথা বলে কেউ আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের প্রশ্নে জনতার ঐক্যে ফাটল ধরাতে আসবেন না।’ হাসনাতের স্ট্যাটাস ঘিরে বহুমুখী প্রতিক্রিয়ার মধ্যে গতকাল রাত ৮টায় জরুরি সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, ‘প্রধান উপদেষ্টার এ ধরনের বক্তব্যের আমরা নিন্দা জানাই। জুলাই গণহত্যা ও পিলখানা হত্যাকা-ের বিচারের আগে এ ধরনের বক্তব্য অনাকাক্সিক্ষত। বিচারের আগে আওয়ামী লীগের যে কোনো ধরনের তৎপরতা ফ্যাসিবাদ পুনর্বহালের নামান্তর। মাফিয়ালীগের রাজনীতির যে কোনো ধরনের তৎপরতাকে প্রতিরোধ করা হবে। কারণ, আওয়ামী লীগ কোনো গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল নয়, এটি একটি ফ্যাসিবাদী দল।’ আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে নাহিদ বলেন, জুলাই গণহত্যার বিচার চলাকালে আওয়ামী লীগের নিবন্ধন বাতিল ও বিচার করতে হবে। গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর থেকেই দলটিকে বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে নিষিদ্ধ ঘোষণার দাবি উঠে আসছে বিভিন্ন মঞ্চ থেকে। তাদের পুনর্বাসন প্রসঙ্গেও হুঁশিয়ারি দিয়ে আসছে আন্দোলনে অংশ নেয়া ছাত্রনেতা ও অন্যান্য কয়েকটি রাজনৈতিক দলের নেতাসহ বিভিন্ন পক্ষ। আন্দোলনকারী ছাত্রদের চাপের মুখে আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগকে গত অক্টোবরে নিষিদ্ধও করা হয়। তবে, গত কিছু দিন ধরে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের ইস্যুতে নতুন করে সরব হন হাসনাত আব্দুল্লাহ। বেশ কিছু দিন ধরেই তিনি তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ ও ফেরানো ইস্যুতে একের পর এক স্ট্যাটাস দিয়ে আসছেন। বৃহস্পতিবার গভীর রাতে দেয়া স্ট্যাটাসে হাসনাত আব্দুল্লাহ আরো লিখেছেন, ‘আমিসহ আরো দুই জনের কাছে …থেকে এই পরিকল্পনা উপস্থাপন করা হয় ১১ মার্চ, দুপুর ২টা ৩০ এ। আমাদের প্রস্তাব দেয়া হয় আসন সমঝোতার বিনিময়ে আমরা যেন এই প্রস্তাব মেনে নিই। আমাদের বলা হয়, ইতিমধ্যে একাধিক রাজনৈতিক দলকেও এই প্রস্তাব দেয়া হয়েছে— তারা শর্তসাপেক্ষে আওয়ামী লীগ পুনর্বাসনে রাজি হয়েছে। একটি বিরোধী দল থাকার চেয়ে একটি দুর্বল আওয়ামী লীগসহ একাধিক বিরোধী দল থাকা নাকি ভালো। ফলে আপনি দেখবেন গত দুই দিন মিডিয়াতে আওয়ামী লীগের পক্ষে একাধিক রাজনীতিবিদ বয়ান দেয়া শুরু করেছে।’ স্ট্যাটাসে হাসনাত আরো লিখেছেন, ‘আমাদের আরো বলা হয়, রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ যাদের দিয়ে করা হবে, তারা এপ্রিল-মে থেকে শেখ পরিবারের অপরাধ স্বীকার করবে, হাসিনাকে অস্বীকার করবে এবং তারা বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ করবে এমন প্রতিশ্রুতি নিয়ে জনগণের সামনে হাজির হবে। আমাদের এই প্রস্তাব দেয়া হলে আমরা তৎক্ষণাৎ এর বিরোধিতা করি এবং জানাই যে, আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনের পরিকল্পনা বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগের বিচার নিয়ে কাজ করুন।’ রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের ফেরা এবং আগামী নির্বাচনে দলটিকে অংশগ্রহণ করতে দেয়া না দেয়ার প্রশ্নে নতুন করে সৃষ্ট বিতর্কের মধ্যে গতকাল বিএনপি আয়োজিত এক ইফতার অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যুক্ত থাকা দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান তার বক্তব্যে বলেছেন, ‘দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে গৌণ ইস্যুকে মুখ্য ইস্যু বানাতে গিয়ে নিজেদের অজান্তে ফ্যাসিবাদবিরোধী জাতীয় ঐক্যের মধ্যে সংশয়-সন্দেহের জন্ম দেওয়া হয়েছে বা হচ্ছে। আমি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে আবারও বলতে চাই, সরকারের এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া উচিত হবে না, যাতে রাষ্ট্র এবং রাজনীতিতে পলাতক স্বৈরাচারের দোসররা পুনর্বাসিত হওয়ার সুযোগ পায়।’ বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী গতকাল ঢাকার দক্ষিণখানে এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগের যারা অপরাধী তাদের বিচার নিশ্চিত হওয়ার পর যারা হত্যা-লুটপাটে জড়িত নয়, তাদের যদি জনগণ রাজনীতি করার সুযোগ দেয় আমাদের কিছু বলার নেই। যারা ছাত্রহত্যা করেনি, যারা অর্থ লোপাট করেনি, এমন সৎ ব্যক্তি নেতৃত্বে এলে আওয়ামী লীগ কেন রাজনীতি করতে পারবে না?’ গতকাল সকালে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগের পুনর্বাসন জনগণ মেনে নেবে না। বাংলাদেশের নির্যাতিত ১৮ কোটি মানুষের দাবি হলো, গণহত্যাকারীদের বিচার। চব্বিশের শহিদ পরিবারগুলোর পুনর্বাসন। আহত-পঙ্গু অসংখ্য ছাত্র-তরুণ-যুবক-মুক্তিকামী মানুষের সুচিকিৎসা। এ সময় জনগণ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গণহত্যার বিচার দেখতে চায়। এর বাইরে অন্য কিছু ভাবার কোনো সুযোগ নেই।’ আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধের দাবির প্রসঙ্গ জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান জি এম কাদের গতকাল রংপুরে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আওয়ামী লীগ একটা দল। দলের ভেতরে যারা বাস করছে তারা খারাপ হতে পারে। আওয়ামী লীগ একটি গাড়ি-এর ড্রাইভার খারাপ হতে পারে, গাড়িটা তো খারাপ নয়। সবাইকে বুঝতে হবে বিশাল অঙ্কের জনসংখ্যাকে বাইরে রেখে ইচ্ছেমতো যা তা করব-যেটা ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা করেছিল। দেশের অর্ধেক লোককে বাদ দিয়ে নির্বাচন করবেন, কাউকে জোর করে নির্বাচনে আনবেন, কাউকে জোর করে বাদ দেবেন-এ রকম নির্বাচন দেশে গ্রহণযোগ্য হবে না। এরকম করলে দেশে স্থিতিশীলতা আসবে না। এটা করলে দেশ সামনের দিকে সংঘাতময় দুর্যোগপূর্ণ অবস্থায় চলে যাবে।’ আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনের কোনো চেষ্টা বরদাস্ত করা হবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হক। গতকাল জুমার নামাজের পর জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের উত্তর ফটকে এক বিক্ষোভ সমাবেশে তিনি বলেন, ‘এ দেশের তৌহিদি জনতা তাদের বিদায় করেছে, তাদের পুনর্বাসনের কোনো চেষ্টা বরদাস্ত করা হবে না। যদি দেশে আওয়ামী লীগকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করা হয়, তাহলে তা আমাদের লাশের ওপর দিয়ে করতে হবে।’ জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন-এনডিএমের চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ গতকাল নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুকে ‘আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের প্রশ্নে এনডিএম এর অবস্থান’ শিরোনামে এক পোস্টে লিখেছেন, ‘আমাদের কথা পরিষ্কার, বাংলাদেশের পবিত্র জমিনে অগণিত ছাত্র-জনতা, রাজনৈতিক কর্মী, আলেম-ওলামা, শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিকদের রক্ত ঝরানো আওয়ামী লীগ রাজনীতি করতে পারবে না। আওয়ামী লীগকে ফিরিয়ে আনার যে কোনো ‘প্রকল্প’ আমরা রক্তের বিনিময়ে রুখে দিব। নির্বাচন এবং রাজনীতি থেকে আওয়ামী লীগকে দূরে রাখতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে দ্রুত আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে। জনগণ এই ফ্যাসিবাদী শক্তিকে আর দেখতে চায় না। এখানে কোনো ‘ইফস’ অ্যান্ড ‘বাটস’ নেই। ফুলস্টপ।’
মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়, কিন্তু ট্র্যাকব্যাক এবং পিংব্যাক খোলা.