মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্সের ভাস্কর্যগুলো ভাঙচুরের পর দর্শনার্থী কমেছে
ঈদের ছুটিতে দর্শনার্থীদের উপস্থিতি একেবারে নগণ্য
স্টাফ রিপোর্টার: মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত মেহেরপুরের মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্সে দর্শনার্থী কমেছে। ঈদের ছুটিসহ বিশেষ দিনগুলোতে সাধারণত দর্শনার্থীদের পদচারণে মুখরিত থাকতো কমপ্লেক্স এলাকা। তবে এবারের ঈদের ছুটিতে দর্শনার্থীদের উপস্থিতি ছিল একেবারে নগণ্য। গত ৫ আগস্ট স্মৃতি কমপ্লেক্সের তিন শতাধিক ভাস্কর্য ভাঙচুরের কারণে দর্শনার্থীরা আগ্রহ হারিয়েছেন বলে মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। বৃহস্পতিবার (৩ এপ্রিল) বিকেলে সরেজমিনে দেখা যায়, স্মৃতি কমপ্লেক্সের ফটকে দুজন আনসার সদস্য বসে আছেন। দু-একজন করে দর্শনার্থী আসছেন। টিকিট সংগ্রহ করে তারা ভেতরে প্রবেশ করছেন। কমপ্লেক্সের ভেতরের বিভিন্ন অংশে ছুটির দিনের চিরচেনা সেই ভিড় নেই। ফটকে দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্য আবু ওসমান বলেন, ৩০০টি ছোট-বড় ভাস্কর্য ভেঙে ফেলা হয়েছে। পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ ছিল ভাস্কর্যগুলো। প্রতিদিন কয়েক হাজার দর্শনার্থী এখানে আসতেন। কমপ্লেক্সের বেশির ভাগ ভাস্কর্য ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। সে কারণে এখন দর্শনার্থীদের উপস্থিতি কমে গেছে। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল তৎকালীন মেহেরপুর মহকুমার বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার শপথ গ্রহণ করে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলামকে উপরাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী করে মুজিবনগর সরকার গঠন করা হয়। এম এ জি ওসমানীকে সরকারের প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত করা হয়। সেই সরকারের শপথ গ্রহণের স্থান বৈদ্যনাথতলাকে মুজিবনগর নামকরণ করা হয়। ১৯৮৭ সালের ১৭ এপ্রিল উদ্বোধন করা হয় মুজিবনগর স্মৃতিসৌধের। ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এ স্থানকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলতে ১৯৯৬ সালে ওই স্থানে মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্স স্থাপন করার উদ্যোগ নেয়া হয়। স্মৃতি কমপ্লেক্সে একটি মানচিত্রের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন সেক্টরকে উপস্থাপন করা হয়। কমপ্লেক্সে মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাবলির স্মারক ম্যুরাল স্থাপন করা হয়েছিল। পুলিশ ও স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ৫ আগস্ট বিকেলে শতাধিক মানুষের একটি দল রড, বাঁশ, হাতুড়ি নিয়ে স্মৃতি কমপ্লেক্সে প্রবেশ করে। প্রথমে তারা শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্যের মাথার অংশ ভেঙে ফেলে। একই সময়ে এলোপাতাড়িভাবে আঘাত করে ‘১৭ এপ্রিলের গার্ড অব অনার’ ভাস্কর্যটিতে। আরেকটি দল ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানের আত্মসমর্পণের ভাস্কর্যগুলোতে আঘাত করে। তবে সেখানে খুব বেশি ভাঙচুর করতে পারেনি তারা। পরে কমপ্লেক্সের মধ্যে দেশের মানচিত্রের আদলে তৈরি করা মুক্তিযুদ্ধের ১১টি সেক্টরে যুদ্ধের বর্ণনা-সংবলিত ছোট ভাস্কর্যগুলো ভেঙে আশপাশে ছুড়ে ফেলে। আরও একটি দল শহীদ স্মৃতিসৌধের প্রধান ফটকটি ভেঙে নিয়ে যায়। ভাঙচুর হওয়া ভাস্কর্যগুলোর কোনো সংস্কার এখনো করা হয়নি। মুজিবনগর স্মৃতিসৌধের কেয়ারটেকার সুভাষ মল্লিক বলেন, ঈদের ছুটির দিনগুলোতে স্মৃতিসৌধ এলাকায় দর্শনার্থীদের ভিড় লেগে থাকত। ঠিক সময়মতো দুপুরের খাবার খাওয়া হতো না। এখন অলস সময় পার করতে হচ্ছে। দর্শনার্থী নেই বললেই চলে।
মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্স ঘিরে দুই শতাধিক ভ্যান চলাচল করত। দর্শনার্থীদের ভ্যানে করে স্মৃতি কমপ্লেক্সের বিভিন্ন স্থান ঘোরানো হতো। কমপ্লেক্স চত্বরের ভ্যানচালকদের একজন মহসিন মল্লিক বলেন, ‘দর্শনার্থীরা খুশি হয়ে টাকা দিতেন। গড়ে প্রতিদিন একজন ভ্যানচালকের দেড় থেকে দুই হাজার টাকা আয় হতো। এখন বেশির ভাগ ভ্যানচালক ভ্যান বিক্রি করে কৃষিকাজে বা দিনমজুরিতে লেগে পড়েছে। আমাদের মতো কয়েকজন রয়েছে এখনো। দিনে ২০০ টাকাও আয় হচ্ছে না। সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।’
মুজিবনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হারিজ মিয়া বলেন, হঠাৎ করেই মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্স জনমানবশূন্য হয়ে পড়েছে। আগে সন্ধ্যা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের ভিড় লেগে থাকত। দেশের নানা প্রান্ত থেকে শিক্ষার্থীরা শিক্ষাসফরে আসত এখানে। স্মৃতি কমপ্লেক্সের ভেতরে পা ফেলার জায়গা থাকত না। দর্শনার্থীদের প্রধান আকর্ষণ ছিল স্মৃতিসৌধ, আম্রকানন, ছোট-বড় ভাস্কর্য। ভাস্কর্যগুলো ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে দৃর্বত্তরা। এ বিষয়ে মেহেরপুরের জেলা প্রশাসক সিফাত মেহনাজ বলেন, মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্সের বিষয়ে সরকারিভাবে উদ্যোগ নেয়া হবে। আবারও যেন পর্যটকে মুখরিত হয়, সেই ব্যবস্থা করতে হবে।
মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়, কিন্তু ট্র্যাকব্যাক এবং পিংব্যাক খোলা.