সুদখোররা সমাজের দারিদ্র্য বিমোচনে অন্যতম অন্তরায়

৩০

সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে রয়েছে সুদখোর। এরা অধিকাংশ সময়ই সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। অনেকেই জরুরি প্রয়োজনে অনেকটা নিরুপায় হয়েই চড়া সুদে টাকা নিয়ে সর্বস্বান্ত হন। অনেকের হারাতে হয় আবাদি জমি। কেউ কেউ হারান ভিটে। আয়রোজগারের প্রতিষ্ঠান হারিয়ে দিশেহারা হওয়া ব্যবসায়ীর সংখ্যাও সমাজে দিন দিন বাড়ছে। অথচ সুদখোরদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া যাচ্ছে না। কারণ, সুদে যখন টাকা দেয় তখন টাকা গ্রহীতার নিকট থেকে শাদা চেকে স্বাক্ষরই শুধু করিয়ে নেয়া হয় না, শাদা স্ট্যাম্পেও স্বাক্ষর করিয়ে নেয় অধিকাংশ সুদখোর। পরে ওই চেকে মোটা অঙ্কের টাকা লিখে ওরাই আইনের পথে হাঁটে। স্ট্যাম্পে জমি জমার বায়নানামাসহ যা খুশি তাই লিখে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকে সুদখোররা। ফলে সুদে টাকা নেয়া ব্যক্তিরা দিশেহারা হয়ে পড়েন।
এক সময় দাদন ব্যবসায়ীদের কাছে জিম্মি থাকতো অধিকাংশ কৃষক। ফসল উঠলেই দাদন ব্যবসায়ী ইচ্ছে মতো দরে ফসল নিয়ে নিতো। অবর্ণনীয় পরিশ্রম করে ফসল ফলিয়েও ভাগ্যের চাকা ঘোরাতে পারতেন না ওই কৃষকেরা। সেই অবস্থার কিছুটা পরিবর্তন হলেও কিছু এলাকায় দাদন ব্যবসা এখনও বিদ্যমান। ওদের চিহ্নিত করার তেমন উদ্যোগ নেই। অভিযোগও করার সাহস রাখেন না দাদনের শিকার প্রান্তিক কৃষকরা। দাদন ব্যবসা কিছুটা কমলেও চড়া সুদে টাকা দেয়া সুদখোরের সংখ্যা বেড়েছে। বাড়বেই বা না কেন? দিন আনা দিন খাওয়া পরিবারের কোনো এক সদস্য অসুস্থ হলে সরকারি হাসাপাতালগুলোতে চিকিৎসার নিশ্চিয়তা নেই। উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোগী রেফার করার রেওয়াজ যেমন দিন দিন বেড়েই চলেছে, তেমনই জেলা পর্যায়ের হাসপাতালেও চিকিৎসার মান নিয়ে সন্তুষ্ট হওয়ার জো নেই। তারপর রয়েছে স্বাস্থ্য সেবার নামের বেসরকারি চিকিৎসা সেবার অসংখ্য দোকান। ওইসব স্থানে গেলে কিভাবে টাকা আদায় করা হয় তা ভুক্তভোগীরা ছাড়া অন্যদের উপলব্ধি করাও কঠিন। শুধু কি চিকিৎসা? কন্যাদায়, সন্তানকে উচ্চ শিক্ষাসহ বছরান্তে আবাদে লোকসানের ধকল সামলাতে গিয়ে অনেকেরই সুদে টাকা নেয়ার দিকে হাঁটতে হয়। তাছাড়া ক্ষুদ্র দোকানিদের অনেকেই পুঁজিপতিতের পুঁজির মারপ্যাঁচে পুঁজিহারা হয়ে সুদে টাকা নেয়া ছাড়া উপায় থাকে না। মূলত এসব কারণেই শহরে ও গ্রামে সুদ ব্যবসায়ী বেড়েছে।
সুদখোর চিহ্নিত করে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেয়ার পাশাপাশি যেসব কারণে হতদরিদ্র খেটে খাওয়া এবং অল্পপুঁজির ব্যবসায়ীদের সুদ নিতে হয় সেসব কারণ খতিয়ে দেখে বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নেয়া দরকার। দারিদ্র্য বিমোচনে সরকারের প্রচেষ্টা তখনই সফল হবে যখন চিকিৎসা সেবা প্রদানের সাংবিধানিক অধিকার শতভাগ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। তাছাড়া কৃষিপণ্য উৎপাদন খরচ হ্রাস ও বিপণনে ন্যায্য মূল্য পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করার পাশাপাশি জামানত ছাড়াই সহজ সরল সুদে সরকারিভাবে ঋণ প্রদানের বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে। ঋণগ্রহণে হয়রানি বন্ধে মাঠ পর্যায়ে নজরদারি বাড়িয়ে হয়রানিমুক্ত পরিবেশে ঋণ আদান প্রদানের সুষ্ঠু পরিবেশ গড়া দরকার। সুদখোরদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেয়া হয় না বলেই ৫০ হাজার টাকা দিয়ে ৩ লাখ টাকা আদায়ের পরও ক্ষান্ত হচ্ছে না সুদখোর।

Leave A Reply

Your email address will not be published.