|
|
যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেসে শুনানি : বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতি ভয়াবহ  মাথাভাঙ্গা মনিটর: যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেসে মানবাধিকার বিষয়ক কমিটি বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতিকে ভয়াবহ উল্লেখ করে অবিলম্বে এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। কমিশন বলেছে, হত্যা, নিপীড়ন, গুমবিরোধী ও সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন বাংলাদেশের নিত্যনৈমিত্তিক চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ বিষয়ে ত্বরিত ব্যবস্থা না নিলে এটা বাংলাদেশের ইমেজ ও উন্নয়নে মারাত্মক প্রভাব ফেলবে বলে তারা উল্লেখ করেন।
বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেসের টম ল্যান্টোস হিউম্যান রাইটস কমিশন বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে এ শুনানির আয়োজন করে। যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেসের রেবার্ন ভবনের কমিটি রুমে গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হয় এ শুনানি। এতে সভাপতিত্ব করেন কমিশনের কো-চেয়ারম্যান বোস্টন থেকে নির্বাচিত কংগ্রেস সদস্য জেমস ম্যাকগভর্ন।
শুনানিতে সঞ্চালক ছিলেন, বাংলাদেশ ককাসের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা কংগ্রেসম্যান জোসেফ ক্রাউলি। শুনানিতে যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেসের প্রথম মুসলিম সদস্য ক্যাথ এলিসনও অংশ নেন। মানবাধিকার বিষয়ক শুনানিতে প্যানালিস্ট হিসেবে অংশ নেন- স্টেট ডিপার্টমেন্টের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী রবার্ট ব্লেক, আন্তর্জাতিক শ্রমবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যারিক বিয়েল, আমেরিকান সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল লেবার সলিডারিটির এশিয়া অঞ্চলের প্রোগ্রাম ডিরেক্টর টিম রেন ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া বিষয়ক পরিচালক জন শিফন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে টম ল্যান্টোস মানবাধিকার বিষয়ক কমিশনের কো-চেয়ার বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে কড়া সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, একজন মানুষ হত্যা আর মিলিয়ন হত্যা সমান। এক্ষেত্রে বাংলাদেশে র্যাবের হাতে অগণিত মানুষের প্রাণ হরণ হচ্ছে। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড গণতান্ত্রিক কোনো সমাজে গ্রহণীয় হতে পারে না।
তিনি বলেন, বিপদগ্রস্ত রোহিঙ্গা শরণার্থীরা প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশ সীমান্তে এলে তাদের আশ্রয় না দিয়ে ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে। এটাকে মানবতা এবং মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেন তিনি। আন্তর্জাতিক ক্রাইম ট্রাইব্যুনালের নাম উল্লেখ না করে তিনি বাংলাদেশে ক্যাঙ্গারু ট্রায়াল বন্ধ করে সবার জন্য অবারিত স্বচ্ছ বিচারের দাবি করেন। অন্যথায় এটা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি। কমিশনের চেয়ারম্যানের বক্তব্যের পর দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী রবার্ট ব্লেক বলেন, বাংলাদেশ নিয়ে যতো কথা বলা হচ্ছে তার বিপরীতে সাফল্যের অনেক কথাও আছে। এ প্রসঙ্গে তিনি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বর্তমান সরকারের ক্ষমতারোহণ এবং সন্ত্রাসবাদ রোধে সাফল্যের কথা উল্লেখ করেন। তবে তিনি রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে দিয়ে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদকে অবজ্ঞা করেছে বলে মন্তব্য করেন।
গ্রামীণ ব্যাংক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ড. ইউনূসের বিকল্প এখন কাউকে খুঁজে বের করতে হবে- যাতে গ্রামীণে ড. ইউনূসের শূন্যতা ধরা না পড়ে।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রসঙ্গে কংগ্রেসম্যান ক্যাথ এলিসনের এক প্রশ্নের জবাবে রবার্ট ব্লেক বলেন, বাংলাদেশ সরকার যুদ্ধাপরাধ বিচার শুরু করার পর আমাদের যুদ্ধাপরাধ বিষয়ক দূত এরই মধ্যে দু’বার বাংলাদেশ সফর করেছেন। একটি স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য বিচারানুষ্ঠান সম্পন্ন করার লক্ষ্যে রাষ্ট্রদূত স্টিফেন র্যাপ কিছু সুপারিশমালা সরকারকে দিয়েছিলেন। কিন্তু এর কিছুই বাস্তবায়ন হয়নি।
তিনি বলেন, যুদ্ধাপরাধ বিচার কোনো বিশেষ দল, বিশেষ করে জামায়াতের বিরুদ্ধে পরিচালিত হচ্ছে-এমন সন্দেহের অবসান সরকারকেই করতে হবে।
রবার্ট ব্লেক বলেন, গার্মেন্টস শ্রমিক আমিনুল ইসলাম হত্যার পর আমরা এর সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছি। কিন্তু এখনও কোনো হদিস নেই। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনের বাংলাদেশ সফরের সময় আমিনুল ইসলাম হত্যা ও বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর গুম হওয়া নিয়ে তিনি নিজেই প্রশ্ন তুলেছেন। কিন্তু এখনও এর কোনো সুরাহা হয়নি।
রবার্ট ব্লেক বলেন, বাংলাদেশে র্যাবের হাতে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে ৩৪টি। অথচ এর আগে এর সংখ্যা ছিলো আরও বেশি। শুনানিতে কংগ্রেসম্যান জোসেফ ক্রাউলি বলেন, আমি আওয়ামী লীগ বা বিএনপি নই; আমার মুখ্য উদ্দেশ্য হচ্ছে বাংলাদেশের উন্নয়ন। এক্ষেত্রে সরকারের সমালোচনা সত্ত্বেও তিনি বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তুলে ধরেন। তবে জোসেফ ক্রাউলি মিয়ামারের শরণার্থীদের ফিরিয়ে দেয়ার কড়া সমালোচনা করে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের কর্মকর্তাকে প্রশ্ন করেন, পৃথিবীতে এমন ঘটনার নজির আছে কি-না? এর উত্তরে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ কর্মকর্তা বলেন, পৃথিবীতে বিভিন্ন ঘটনা ঘটেছে। তবে বাংলাদেশ মিয়ানমারের শরণার্থীদের সাথে যে ব্যবহার করেছে, এটাকে তিনি অতীব নিষ্ঠুর ও অমানবিক বলে মন্তব্য করেন।
হিউম্যান রাইটসের পক্ষে র্যাব ও আন্তর্জাতিক ওয়ার ক্রাইম ট্রাইব্যুনালের সমালোচনা করে এটাকে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করার দাবি জানানো হয়। শুনানিতে অপর বক্তারা বাংলাদেশে শ্রম অধিকার ও এর বাস্তবায়নে সরকারি ব্যর্থতার সমালোচনা করে এটা ঠিক না হলে এর খেসারত অনেক বড় হবে বলে মন্তব্য করেন। এ প্রসঙ্গে ওয়ালমার্টসহ বিভিন্ন কোম্পানি বাংলাদেশের পণ্য বয়কট করতে পারে কি-না? প্রশ্ন করা হলে একজন পেনালিস্ট বলেন, আমরা যেসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করছি, এগুলো ঠিক না হলে তা অসম্ভব নয়।
অনুষ্ঠানে কংগ্রেসম্যান জোসেফ ক্রাউলি কিছু কিছু ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রশংসা করে দেশটিকে এগিয়ে নিতে সবার সহযোগিতা কামনা করেন। শুনানি অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত আকরামুল কাদেরের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, পৃথিবীর অনেক দেশের চেয়ে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি অনেক সন্তোষজনক। বাংলাদেশ সঠিক পথেই এগোচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। শুনানিতে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সভাপতি ড. সিদ্দিকুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদুর রহমান সাজ্জাদ, ড. নুরুন্নবী, আব্দুস সামাদ আজাদ, হাজি এনামসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন।
|
|