|
|
চালক জীবন দিয়ে বাঁচিয়ে গেলেন চুয়াডাঙ্গা ডিলাক্সের ৪০ যাত্রীর প্রাণ  স্টাফ রিপোর্টার: চুয়াডাঙ্গা ডিলাক্সের ৪০ জন বাসযাত্রীকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়ে চালক রমজান আলী (৫৫) নিজেই চলে গেলেন। গতকাল শনিবার ভোরে চুয়াডাঙ্গা-ঢাকা মহাসড়কের কালামপুর-ধামরাইর মাঝামাঝি সুতিপাড়া নামক স্থানে চলন্ত গাড়িতে চালক হৃদরোগে আক্রান্ত হলেও দক্ষতার সাথে দ্রুত গতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিজেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।
বাসযাত্রীরা জানান, প্রায় ৮০ কিলোমিটার বেগে চলা অবস্থায় গাড়ির চালক হৃদরোগে আক্রান্ত হন। মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি নিজের সিটে বসে প্রাণপণ চেষ্টা করে গাড়িটি নিয়ন্ত্রণে নেন। এরপরই তিনি মারা যান। রমজান আলী চুয়াডাঙ্গা দৌলাতদিয়াড় দক্ষিণপাড়ার আকুল মালিতার ছেলে। গতকাল সন্ধ্যায় তার লাশ নিজ বাড়িতে নেয়া হয়। গতরাত ১০টার দিকে দৌলাতদিয়াড় দক্ষিণপাড়া কবরস্থানে দাফন কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে।
জানা গেছে, চুয়াডাঙ্গা ডিলাক্সের যাত্রীবাহী একটি কোচ শুক্রবার রাত সাড়ে ৯টায় চুয়াডাঙ্গা থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়। দৌলাতদিয়াড়-পাটুরিয়া ঘাটে জ্যাম ছিলো। দীর্ঘ বিলম্ব হয়। ভোরে ঘাট পার হয়ে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা শুরু হয়। কোচের সুপারভাইজার রনি জানান, গাড়ীটি প্রায় ৮০ কিলোমিটার বেগে চলা অবস্থায় কালামপুর-ধামরায়ের মাঝামাঝি সুতিপাড়া নামক স্থানে পৌঁছুলে চালক রমজান আলী হৃদরোগে আক্রান্ত হন। তখন ভোর ৩টা। একটু জোরে খিচুনি দিয়ে ওঠার পরই তিনি নিজের সিটে লুটিয়ে পড়েন। এরপরও তিনি প্রাণপণ চেষ্টা করে গাড়িটি নিরাপদে নেন। চুয়াডাঙ্গা ডিলাক্সের যাত্রী বাবলু জানান, আমার মনে হচ্ছে নতুন একটি জীবন পেলাম। তিনি বলেন, এটা অলৌকিক ছাড়া আর কিছুই নয়। এখনো বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে, আমরা বেঁচে আছি। জসিম নামে অপর এক যাত্রী বলেন, গাড়িটি যে গতিতে ছিলো, মৃত্যু সবার অবধারিত ছিলো; কিন্তু চালক গাড়ীটি নিয়ন্ত্রণে নিতে সড়কের পাশে একটি ছোট ডোবায় নামিয়ে দিয়ে যাত্রীদের নিরাপদে নেন। এরপরই তিনি ঢলে পড়েন মৃত্যুর কোলে।
চুয়াডাঙ্গা ডিলাক্সের স্বত্বাধিকারী মজিবুল হক খোকন জানান, গাড়িটি ডোবায় নামার আগে রয়েছে বড়বড় দুটি গাছ। গাড়িটি কীভাবে ওই গাছ ভেদ করে তার ভেতর দিয়ে অক্ষত অবস্থায় ডোবায় নামলো তা বিশ্বাস করতে পারছি না।
প্রাণ দিয়ে ৪০ জন যাত্রীকে রক্ষা করে যাওয়া চালক রমজান আলী ছিলেন ৫ মেয়ের জনক। তার ছোট জামাই ওলিয়ার রহমান জানান, দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে পরিবহনের চালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন রমজান আলী। চুয়াডাঙ্গা ডিলাক্স ব্যানারে পরিবহন সংস্থাটি শুরুর পর থেকেই তিনি এ সংস্থার কোচ চালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। বছর তিনেক আগে হৃদরোগে আক্রান্ত হন। বুকে রিং লাগানো হয়। নাইট্রোগ্লিসারিন (ইনহেলার) নিতেন। সব সময়ই সাথে থাকতো। গতপরশু যখন তিনি কোচ নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন, তখন ভুলে ওই ইনহেলারটি বাড়িতে ফেলে যান। ঘাট পার হওয়ার জন্য দীর্ঘ সময় যখন জ্যামে পড়েন, তখনই তিনি অবশ্য অসুস্থতা বোধ করেন। গতকাল সন্ধ্যায় লাশ নিজ বাড়িতে নেয়া হয়। রাত ১০টায় দাফন কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে।
চুয়াডাঙ্গা পরিবহন সেক্টরের নবীন-প্রবীণ সকলেই একই ভাষায় বলেছেন, রমজান ড্রাইভারের সাথে কারো কোনোদিন বিরোধ হয়নি। তিনি সকলের সাথেই সুন্দর ব্যবহার করতেন। কথা কম বললেও কখনো কাউকে নিয়ে তিনি বিরূপ মন্তব্য করেননি। চালক হিসেবে তার দক্ষতার তুলনা হয় না। অবশেষে তিনি সকলকে কাঁদিয়ে চলে গেলেন। এমনভাবে চলে গেলেন যে তিনি চালক সমাজে ইতিহাস হয়ে থাকবেন। মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করেছেন সংশ্লিষ্ট সকলে।
|
|