|
|
মাদকচক্রের কাছে আত্মসমর্পণের পথে সমাজ?
মাদক পাচারকারীরা সমাজের দরিদ্র অসহায় পরিবারের শুধু নারীদেরই ব্যবহার করছে না, তারা শিশু কিশোরদেরও মাদক পাচার কাজে নিয়োজিত করছে। মাত্র ১০ বছর বয়সী এক শিশু মাদক পাচারের সময় পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে। অভিনব কৌশলে তাকে দিয়ে ফেনসিডিল নামক মাদক পাচার করা হচ্ছিলো। শিশু সাদী অবশ্য বলেছে, ওই টায়ারের মধ্যে যে ফেনসিডিল তা ধরা পড়ার আগে সে বুঝতেই পারেনি। তাছাড়া সে তার দরিদ্র পিতার অসুস্থতাসহ পারিবারিক অসহায়ত্বের কথাও তুলে ধরেছে। পুলিশ অবশ্য তার কথার সত্যতা যাচাই করছে বলে পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মাদক সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে। মাদকের কালো থাবা গ্রাস করছে যুবসমাজ থেকে শুরু করে পেশাজীবীদের অনেককেই। মাদকাসক্ত হয়ে বহু পেশাজীবী পেশা হারিয়ে হয়েছে পথের ভিখেরি। মেধাবীদের অনেকের সুন্দর ভবিষ্যত হারিয়ে যাচ্ছে অধপতনে। অসংখ্য সংসার তছনছ হয়েছে। বহু পরিবারে জ্বলছে অশান্তির আগুন। মাদকের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে গেলে অনেক স্থানেই উল্টো মামলা করে হয়রানির হুমকিই শুধু দেয়া হচ্ছে না, অনেক ক্ষেত্রে মিথ্যা অভিযোগে ফাসানোও হচ্ছে। অবাক হলেও সত্য যে, প্রকৃত নিগৃহীত অনেককেই অভিযোগ নিয়ে থানায় গেলে হয়রানির শিকার হতে হয়। এরকম অভিযোগের তো অন্ত নেই। অথচ দেখা গেছে, মাদকচক্রের সাজানো নাটকের নেপথ্য উন্মোচনের আগেই মাদকবিরোধী অভিযানে সামাজিক গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে ফেলা হয়। চুয়াডাঙ্গাতে এরকম উদাহরণের তালিকা খুব ছোট নয়। এরকম কি হওয়ার কথা? দেশে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর আছে। এ দফতরের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা কর্মচারীদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ ভুরিভুরি। টাকা দিলে প্রকাশ্যে মাদক বিক্রির অলিখিত অনুমোদন মেলে, মাসহারা না দিলেই ধরে মামলাসহ পুলিশে সোপর্দ করা হয় বলেও অভিযোগ অনেকের। পুলিশ মাঝে মাঝে মাদকবিরোধী অভিযান জোরদার করে। ঝিমিয়ে যায়। নেপথ্য নিয়ে নানা অভিযোগ যেমন রয়েছে, তেমনই পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি পাল্টা যুক্তিও রয়েছে। ৱ্যাব’র অভিযান লাগাতার থাকলেও তা যে মাদকমুক্ত সমাজ গঠনের জন্য যথেষ্ট নয়, তা বলাই বাহুল্য। মাদকমুক্ত সমাজ গঠনের জন্য দরকার সম্মিলিত প্রচেষ্টা। অভিভাবকদের সচেতনতা তো দরকারই। কিন্তু মাদক যদি সমাজের অলিতে গলিতে সহজলভ্য হয় তা হলে সন্তান সামলাতে গিয়ে অভিভাবকদের হিমশিম খেতে হয়। হচ্ছেও তাই।
যে কোনো মূল্যে মাদকমুক্ত সমাজ গঠন করতে হবে। এ তাগিদ সচেতনমাত্রই উপলব্ধি করেন; কিন্তু বাস্তবে সচেতন মহলের মাদকবিরোধী জোরালো পদক্ষেপ লক্ষ্য করা যায় না। এর আড়ালে মিথ্যা মামলায় হয়রানির ভয়? অমূলক নয়। কারণ চুয়াডাঙ্গার বহুল আলোচিত হকপাড়ার মাদকবিরোধী কমিটির শীর্ষস্থানীয় কয়েকজনকে তো বোমা মামলায় হাজতের ভাত খেতে হয়েছিলো। জীবননগর দেহাটিতে মহিলা দিয়ে হয়রানির অভিযোগ এলাকাবাসীকে কিংকর্তব্যবিমূঢ় করলেও পুলিশ তো ছিলো মহিলার পক্ষেই। সর্বশেষ মুন্সিগঞ্জ জেহালায় তো অপহরণ নাটকের নেপথ্য উন্মোচন করে মিথ্যা মামলা থেকে কয়েকজনকে পুলিশ রক্ষা করতে পেরেছে। এক্ষেত্রে অবশ্য আলমডাঙ্গা থানা পুলিশকে সাধুবাদ জানাতেই হয়। মাদক পাচার রোধে ভয়ে ভীত হলে যেমন চলবে না। তেমনই পাশের বাড়ির ছেলে বা মেয়ে মাদকের কবলে পড়ে হাবুডুবু খাচ্ছে দেখে মুখ আড়ালে নিয়ে হাসলে নিজেরও ওই দশার মধ্যে পড়তে হবে। মনে রাখতে হবে, পাশের বাড়ির আগুনের ফুলকি নিজের বাড়িতেও এসে পড়তে পারে। সে কারণেই নীরবতা নয়, মাদকবিরোধী গণজাগরণ জরুরি। মাদকবিরোধী সামাজিক আন্দোলন জোরদার হলে অবশ্যই মাদকচক্রের অপতৎপরতায় ভাটা পড়বে। মাদক পাচারকারীদের ধরলেই হবে না, মাদকচক্রের রাঘববোয়ালদের ধরে আইনে সোপর্দ করতে হবে। এ জন্য অবশ্যই দরকার মাদকবিরোধী লাগাতার অভিযান। মাদকচক্রের শিকড় উপড়াতে না পারলে এক সময় মাদকচক্রের কাছে সকলকে অসহায়ের মতো আত্মসর্পণ করতে হবে। পরিস্থিতি যে সেদিকেই যাচ্ছে তা ১০ বছরের শিশুর হাতে মাদক দেখে সহজেই অনুমান করা যায়।
মাদকের সাথে আপস নেই। মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে হলে অবশ্যই সীমান্তের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। দেশে অধিকাংশ মাদকই প্রতিবেশী দেশ থেকে পাচার করে আনা হয়। অভিভাবকদের দায়িত্বশীল হতে হবে। সমাজের দরিদ্র পরিবারের নারী শিশুদের মাধ্যমে মাদক পাচাররোধে আর্থসামাজিক উন্নয়নে কর্মসংস্থান গড়ে তোলার লক্ষ্যে প্রত্যন্ত অঞ্চলেও বিনিয়োগের পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করার বিশেষ উদ্যোগ নেয়ার দায়িত্ব অবশ্যই সমাজের দায়িত্বশীলদের তথা রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের। মাদকবিরোধী সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টিতেও শিক্ষিত সমাজকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।
|
|